জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এর আওতায় দেশটির বাজারে প্রথম দিন থেকেই তৈরি পোশাকসহ ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশী পণ্য রফতানিতে মিলবে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা। বিনিময়ে বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্য পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে। এরপর ছয় থেকে আট বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে আরো ২ হাজার ৭০২টি জাপানি পণ্য শুল্কছাড়ের আওতায় আসবে। একপর্যায়ে উভয় দেশে মোট ৯ হাজার ৩৫৪টি পণ্যে কোনো শুল্ক থাকবে না। এর মধ্যে বাংলাদেশী পণ্যের সংখ্যা হবে ৭ হাজার ৪৩৬টি।
জাপানের রাজধানী টোকিওতে গতকাল এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ সময় বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও নিজ নিজ দেশের পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের তথ্য অধিদপ্তর এক তথ্য বিবরণীতে জানিয়েছে, পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে ঢাকা ও টোকিওতে অনুষ্ঠিত সাত দফা দরকষাকষির ফল হচ্ছে এ চুক্তি।
ইপিএ স্বাক্ষরকে দ্বিপক্ষীয় ‘দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতিফলন’ হিসেবে বর্ণনা করে অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘এ চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক দলিল নয়; এটি বাংলাদেশের উজ্জ্বল অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আমাদের দুই দেশের মধ্যে গভীর পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ।’ এ চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন পারস্পরিক সমৃদ্ধির একটি নতুন অধ্যায় শুরু করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তথ্য বিবরণীতে আরো বলা হয়েছে, পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা যোগ হওয়ায় এখন থেকে কাঁচামাল নিয়ে কোনো জটিলতা ছাড়াই বাংলাদেশী পোশাক খুব সহজে জাপানে রফতানি করা যাবে। পাশাপাশি জাপানের আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, শিক্ষা, কেয়ারগিভিং এবং নার্সিংয়ের মতো প্রায় ১৬টি বিভাগে ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশী দক্ষ পেশাজীবীদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে। এটি দেশের মানুষের জন্য জাপানে অধিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। বিপরীতে জাপানের জন্য ১২টি বিভাগের আওতায় ৯৮টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ।
ইপিএ স্বাক্ষরের ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং লজিস্টিকস প্রভৃতি খাতে জাপানি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানি উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ হলে দেশীয় পণ্যের মান বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশ এবং একটি দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে এ চুক্তি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে বলে তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে।
তবে জাপানের গাড়ি এ চুক্তির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনে জাপানি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইপিএর আওতায় কয়েক ধাপে শুল্ক ছাড় দিতে হবে বাংলাদেশকে। সর্বশেষ পর্যায়ে সব পণ্যে শুল্কছাড় কার্যকর হলে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে ইপিএ স্বাক্ষর না হলে এলডিসি উত্তরণের পর জাপানের বাজারে শুল্ক সুবিধা হারিয়ে বাংলাদেশের রফতানি ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কমে যেতে পারত।
জানা যায়, বর্তমানে এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য জাপান। দেশটিতে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার, যার বেশির ভাগই তৈরি পোশাক। অন্যদিকে জাপান থেকে আমদানি ১৮০ কোটি থেকে ২৭০ কোটি ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ইপিএ কার্যকর হলে একদিকে রফতানি বাড়বে, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। শুল্ক সুবিধার পাশাপাশি এ চুক্তিতে সেবা খাত, বিনিয়োগ, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও মেধাস্বত্ব অধিকার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচিসহ উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।